বিকাল ৩:১৫ | শনিবার | ২৯শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | বর্ষাকাল
পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে যুদ্ধের মধ্যেও কেন এত চাঙা রুশ অর্থনীতি

পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে যুদ্ধের মধ্যেও কেন এত চাঙা রুশ অর্থনীতি

রাশিয়ার মূল্যস্ফীতির ইতিহাস অনেক দীর্ঘ ও বেদনাময়। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পর দেশটিতে সবকিছুর দাম বেড়ে গিয়েছিল, এমনকি জোসেফ স্তালিনের শাসনামলের প্রথম ভাগ পর্যন্ত সেই মূল্যস্ফীতির জের চলেছে। এরপর একসময় যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেল, তখনো দেশটি উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে পড়ে। ২০০৭-০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট ও ২০১৪ সালে ইউক্রেনে ভ্লাদিমির পুতিনের প্রথম অভিযানের পরও দেশটি উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করেছে।

 এখন ২০২৩ সাল শেষ হতে চলেছে, ইউক্রেন যুদ্ধের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি আসন্ন, এই সময় রাশিয়া আবার উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে পড়েছে।

ইকোনমিস্ট জানাচ্ছে, নভেম্বর মাসে দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল বলে রুশ সরকারের হিসাবে দেখা গেছে। আগের মাস অর্থাৎ অক্টোবরে এই হার ছিল ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২২ সালের শুরুতে রাশিয়া যখন দ্বিতীয়বারের মতো ইউক্রেনে অভিযান শুরু করল, তখন মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে গিয়েছিল। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ে আছে।

 রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির শেষ বৈঠকে নীতি সুদহার ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে। সুদহার যতটা বাড়বে বলে প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় দ্বিগুণ। চলতি মাসের ১৫ তারিখে আবারও মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠক আছে, তখন নীতি সুদহার আরও এক দফা বাড়ানো হতে পারে। তারপরও বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করছেন, মূল্যস্ফীতির হার বাড়তে থাকবে।

মুদ্রার মান পড়ে যাওয়ার কারণে ২০২২ সালে রাশিয়ার মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল। রাশিয়া ইউক্রেনে অভিযান শুরু করার পর ডলারের বিপরীতে রুবলের মান ২৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল, সে জন্য আমদানি মূল্য বেড়ে যায়। এখন অবশ্য মুদ্রার মান তেমন একটা প্রভাব ফেলছে না; বস্তুত গত কয়েক মাসে রুবলের দর বেড়েছে। অংশত এর কারণ হচ্ছে, পুঁজির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ। খাদ্যবহির্ভূত ভোক্তা পণ্যের দাম এখন যুদ্ধের আগের সময়ের গড় দামের কাছাকাছি, যদিও এর অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়।

 ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধকালীন অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখা যাবে, দেশটির বিরুদ্ধে এত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অর্থনীতি বিপজ্জনকভাবে চাঙা। বিশেষ করে সেবা খাতের মূল্যস্ফীতি চড়া, যার মধ্যে আছে আইনি পরামর্শের মাশুল থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁয় খাওয়ার ব্যয়—সবকিছুই। মস্কোর রিটজ কার্লটন হোটেল এখন শুধু কার্লটন নামে পরিচিত, সেই হোটেলে রাত্রিযাপনের ব্যয় যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল ২২৫ ডলার, কিন্তু এখন তা ৫০০ ডলারে উন্নীত হয়েছে।

 এই পরিস্থিতির জন্য অনেক অর্থনীতিবিদ রুশ সরকারের ব্যয়ের দিকে আঙুল তুলেছেন। ২০২৪ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে, উন্নীত হবে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ৬ শতাংশে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দেশটি আর কখনোই প্রতিরক্ষা খাতে এত ব্যয় করেনি। পরবর্তী নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে সরকার সামাজিক কল্যাণে ব্যয় বাড়িয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত সেনাদের পরিবারগুলো এখন যে ভাতা পাচ্ছে, তা গত তিন দশকের গড় ভাতার সমান। রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে জানা যায়, রুশ সরকার এখন জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ আর্থিক প্রণোদনা দিচ্ছে; এমনকি কোভিড–১৯ মহামারির সময়ও এতটা দেওয়া হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই রাশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাড়ছে। বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের তথ্যে দেখা যায়, রাশিয়া উচ্চ প্রবৃদ্ধির দিকে এগোচ্ছে। আরেক বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান চেজ রাশিয়ার প্রবৃদ্ধির বিষয়ে পূর্বাভাস বৃদ্ধি করেছে। ভ্লাদিমির পুতিন গর্ব করে বলেছেন, ২০২৩ সালে রাশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। ফলে ইউক্রেনে হামলা শুরু করার সময় অধিকাংশ পশ্চিমা অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিকেরা রুশ অর্থনীতি ধসে যাওয়ার যে পূর্বাভাস করেছিলেন, তাঁরা সবাই ভুল প্রমাণিত হচ্ছেন।

 উচ্চ প্রবৃদ্ধি হলে সাধারণত সমস্যা নেই, কিন্তু রাশিয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, দেশটির অর্থনীতি এই উচ্চ প্রবৃদ্ধির ভার বহন করতে পারবে না। ২০২২ সালের শুরুতে দেশটির সরবরাহ খাত অনেকটা সংকুচিত হয়। উচ্চশিক্ষিত কর্মীসহ হাজার হাজার কর্মী রাশিয়া ত্যাগ করেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশটি থেকে ২৫০ বিলিয়ন বা ২৫ হাজার কোটি ডলারের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছেন, যা যুদ্ধের আগের সময়ের মোট বিদেশি বিনিয়োগের প্রায় অর্ধেক। 

সরকারি ব্যয়বৃদ্ধির কারণে চাহিদা বাড়লেও সরবরাহব্যবস্থা তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলাফল হলো কাঁচামাল, পুঁজি ও শ্রমের মূল্য বেড়ে যাওয়া। বেকারত্বের হার এখন সর্বকালের রেকর্ড ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে শ্রমিকেরা এখন মজুরি বৃদ্ধির দাবি তুলছেন বা তা করার সাহস পাচ্ছেন। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয়হীনভাবে মজুরি বেড়েছে। বৃদ্ধির হার এখন বছরে ১৫ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে কোম্পানিগুলো বাড়তি খরচের ভার ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। 

 এখন নীতি সুদহার বাড়ানো হলে বাজারে চাহিদা কমে যাবে; পরিণতিতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ধারা থামবে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে বা পুঁজির ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলে রুবল আরও শক্তিশালী হবে, তখন আমদানি ব্যয় কমবে। কিন্তু এ সবকিছুই এক নিশ্চল শক্তির বিরুদ্ধে কাজ করছে। সেটা হলো ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধজয়ের আকাঙ্ক্ষা। আর্থিক সক্ষমতা থাকায় তিনি ভবিষ্যতে আরও ব্যয় করতে পারেন, যদিও সেটা মূল্যস্ফীতির হার আরও বৃদ্ধির অশনিসংকেত। বাস্তবতা হলো, অতীতের মতো এখনো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার চেয়ে রাশিয়ার কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
Disqus (0 )